কৃষি-সৌর সহ-বসতি: একই জমিতে ফসল ও বিদ্যুৎ

·DLXN Energy
কৃষি-সৌর সহ-বসতি: একই জমিতে ফসল ও বিদ্যুৎ

অ্যাগ্রিভোল্টাইক্স কী এবং কেন প্রাসঙ্গিক

অ্যাগ্রিভোল্টাইক্স হলো একই ভূমিতে সৌর প্যানেলের সমান্তরালে কৃষি উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার কৌশল। প্রচলিত সোলার ফার্মে পুরো জমি প্যানেল দিয়ে ঢেকে ফেলা হয়, ফলে কৃষিজমি হারিয়ে যায়। কিন্তু অ্যাগ্রিভোল্টাইক সিস্টেমে প্যানেলগুলো মাটি থেকে ২.৫ থেকে ৫ মিটার উঁচুতে স্থাপন করা হয়, যাতে নিচে পর্যাপ্ত আলো, বৃষ্টির পানি এবং ট্রাক্টরের মতো কৃষি যন্ত্রপাতি চলাচলের সুযোগ থাকে। মার্কিন জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি গবেষণাগার (এনআরইএল) জানিয়েছে, এই ব্যবস্থায় জমির প্রায় ৯৭ শতাংশ চাষযোগ্য অবস্থায় সংরক্ষণ করা যায়।
আইইএ-র সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি চাহিদা মেটাতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনা বর্তমানের তুলনায় অন্তত দশ গুণ বাড়াতে হবে, অথচ জমির প্রাপ্যতা ক্রমশ সীমিত হচ্ছে। এই সংকটে দ্বৈত জমি-ব্যবহারকে আইইএ "উচ্চ-প্রভাবশালী সমাধান" হিসেবে চিহ্নিত করেছে। জাপান ২০১৩ সালে প্রথম সরকারি ভর্তুকিতে বাণিজ্যিক অ্যাগ্রিভোল্টাইক প্রকল্প চালু করে; ২০২৩ সাল নাগাদ দেশটিতে দুই হাজারের বেশি স্থাপনা গড়ে উঠেছে, যার বেশিরভাগ ধান ও সবজি চাষের জমিতে।

বিশ্ববাজারে প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগের চিত্র

শিল্প বিশ্লেষক ও ব্লুমবার্গএনইএফ-এর (BloombergNEF) তথ্য মতে, ২০২১ সালে বিশ্বে অ্যাগ্রিভোল্টাইক্সের প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতা প্রায় ১৪ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে, যা ২০১৮ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। জার্মানির ফ্রাউনহোফার ইনস্টিটিউট ফর সোলার এনার্জি সিস্টেমস অবশ্য পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০৫০ সালে এই খাতের বৈশ্বিক ক্ষমতা ৩ থেকে ৪ টেরাওয়াট হতে পারে — যা বর্তমান সমগ্র বিশ্বের সৌরক্ষমতার এক-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি।
চীন এই খাতে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী। চিংহাই প্রদেশে প্রায় ১ গিগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন অ্যাগ্রিভোল্টাইক পার্ক গড়ে তুলেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় জ্বালানি সংস্থা, যেখানে প্যানেলের নিচে ঔষধি গাছ ও পশুখাদ্য চাষ হয়। ফ্রান্স ২০২৪ সালে কঠোর আইন পাস করেছে, যেখানে অ্যাগ্রিভোল্টাইক প্রকল্পের আওতায় ফসলের ফলন নিয়ন্ত্রণমূলক মানের অন্তত ৯০ শতাংশ ধরে রাখা বাধ্যতামূলক। জার্মানিতে ফ্রাউনহোফারের হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে কৃষিজমির মাত্র ৪ শতাংশ ব্যবহার করলেই ৮৫ গিগাওয়াট অ্যাগ্রিভোল্টাইক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব — যা দেশটির ২০৩০ সালের সৌর লক্ষ্যমাত্রার প্রায় অর্ধেক।

প্রকৌশল ও প্রযুক্তির নকশা

অ্যাগ্রিভোল্টাইক স্থাপনার মূল চ্যালেঞ্জ হলো সূর্যালোকের সুষম বণ্টন। ইউনিভার্সিটি অব অ্যারিজোনা ও এনআরইএল-এর যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, স্থির অনুভূমিক প্যানেলের চেয়ে উল্লম্বভাবে ঘোরানো ট্র্যাকিং প্যানেল বেশি কার্যকর। সকালে ও বিকেলে প্যানেল খাড়া অবস্থায় আলো ফসলের গায়ে পড়ে; দুপুরে প্রায় সমতল হয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সর্বোচ্চ করা হয়। গবেষকদের মতে, সেমি-ট্রান্সপারেন্ট বা বিভক্ত প্যানেল ডিজাইন, যেমন অর্ধ-স্বচ্ছ পারভস্কাইট-সিলিকন ট্যান্ডেম সেল, ভবিষ্যতে আরও বেশি কার্যকর হবে। এই প্রযুক্তি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন আমাদের প্রযুক্তি বিভাগ
প্যানেলের উচ্চতা, সারির ব্যবধান ও কাত হওয়ার কোণ নির্ভর করে ফসলের ধরনের ওপর। লম্বা ভুট্টা বা সূর্যমুখীর জন্য প্যানেলের উচ্চতা সাড়ে চার মিটারের বেশি রাখতে হয়, আর আলু, সালাদ শাক বা স্ট্রবেরির জন্য দুই থেকে তিন মিটার যথেষ্ট। ফ্রাউনহোফার আইএসই-এর তৈরি সিমুলেশন মডেল দেখায়, সিঙ্গেল-অ্যাক্সিস ট্র্যাকার ব্যবহার করলে ফসলের আলোপ্রাপ্তি মাত্র ১০-১৫ শতাংশ কমে, অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদন স্থির প্যানেলের চেয়ে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। বাজারে উপলব্ধ সৌর প্যানেল সমাধানগুলোর মধ্যে বাইফেসিয়াল প্যানেল এ কাজে সবচেয়ে উপযোগী, কারণ নিচের প্রতিফলিত আলোও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।

ফসলের ফলন, মাটি ও খামারের বাস্তুসংস্থান

অ্যারিজোনার মরু জলবায়ুতে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যাগ্রিভোল্টাইক সিস্টেমের নিচে চেরি টমেটোর ফলন স্বাভাবিক খামারের চেয়ে ৬৫ শতাংশ বেশি হয়েছে, আর শিমের ফলন বেড়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ। এর কারণ, প্যানেলের ছায়ায় মাটির তাপমাত্রা কম থাকে এবং বাষ্পীভবন হ্রাস পায়, ফলে শুষ্ক অঞ্চলে সেচের পানিও ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয় হয়। গবেষণা দলের প্রধান গ্রেগ ব্যারন-গ্যাফোর্ড জানান, ঠান্ডা প্যানেলের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাও ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়। সামগ্রিকভাবে, "জমি-সমতুল্য অনুপাত" (LER) ১.৩ থেকে ২.১ পর্যন্ত ওঠে — অর্থাৎ একই জমি থেকে কৃষি ও জ্বালানি মিলিয়ে ৩০ থেকে ১১০ শতাংশ বেশি উৎপাদন পাওয়া যায়।
নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে ফলন কিছুটা ভিন্ন। নেদারল্যান্ডস ও জার্মানির পরীক্ষায় আলু, গম ও বার্লির ফলন স্বাভাবিকের ৮০-৯০ শতাংশে নেমে এলেও চাষি দ্বৈত আয়ের কারণে নিট মুনাফায় উন্নতি করেন। আইইইই-র (IEEE) এক সাম্প্রতিক সমীক্ষা বলছে, দীর্ঘমেয়াদে প্যানেলের নিচে মাটির জৈব কার্বন বৃদ্ধি পায়, কারণ উদ্ভিদের আংশিক ছায়ায় মাটির আর্দ্রতা ধরে থাকে এবং মাইক্রোবিয়াল কার্যক্রম বাড়ে। ফলে খরা-প্রবণ অঞ্চলেও টেকসই কৃষি সম্ভব হচ্ছে। ভারী বৃষ্টিপাতের সময় প্যানেল প্রাকৃতিক ছাউনির মতো কাজ করে, যা অতিবৃষ্টি থেকে ফসলকে রক্ষা করে।

অর্থনীতি, ভর্তুকি ও নীতিনির্ধারণ

অ্যাগ্রিভোল্টাইক প্রকল্পের আর্থিক হিসাব এখন আগের চেয়ে আকর্ষণীয়। ব্লুমবার্গএনইএফ-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সৌর প্যানেলের দাম গত দশকে ৮০ শতাংশের বেশি কমেছে, ফলে কৃষকদের জন্য প্যানেল-নিচের কৃষি এখন আগের তুলনায় অনেক কম ঝুঁকিপূর্ণ। একটি সাধারণ হিসাব: ১ মেগাওয়াট অ্যাগ্রিভোল্টাইক স্থাপনায় প্রায় ১.৫-২ একর জমি লাগে; এতে বছরে ১.৩ থেকে ১.৬ লক্ষ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, যা বিক্রি করে কৃষিকাজের অতিরিক্ত আয়ের পাশাপাশি ১৫-২০ হাজার ডলারের বার্ষিক রাজস্ব পাওয়া যায়। ফ্রান্স ও জার্মানিতে সরকার এই স্থাপনার জন্য উচ্চ হারে ফিড-ইন ট্যারিফ দিচ্ছে, আর জাপানে স্থাপন ব্যয়ের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি দেওয়া হয়।
নীতিনির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো খাদ্য নিরাপত্তার গ্যারান্টি। ফ্রান্সের ২০২৪ সালের আইনের মতো Regulations নিশ্চিত করে যে, সৌর প্রকল্প কৃষিজ উৎপাদনশীলতাকে গুরুতরভাবে কমাতে পারবে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের বিধানই অ্যাগ্রিভোল্টাইক্সকে খাতটিকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করবে। খরচ কমাতে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে পারে একীভূত ব্যাটারি স্টোরেজ সমাধান, যাতে দিনের উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সন্ধ্যায় বিক্রি করা যায় এবং কৃষকের আয় স্থিতিশীল থাকে। বড় পরিসরে সফল প্রকল্পের নকশা ও বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা দেখতে পারেন আমাদের প্রকল্প সংগ্রহ-এ। এ ছাড়া স্থানীয় জ্বালানি কোম্পানি ও কৃষি সমবায়ের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়চুক্তিও বিনিয়োগের ঝুঁকি কমায়।

বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার সম্ভাবনা

বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব বিশ্বে সর্বোচ্চ, তাই নতুন সৌর খামারের জন্য জমি খুঁজে পাওয়া ক্রমশ কঠিন হচ্ছে। সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ৪০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আনার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে, যেখানে সৌরবিদ্যুৎ মুখ্য ভূমিকা পালন করবে। এই লক্ষ্যে অ্যাগ্রিভোল্টিক্স একটি যুগোপযোগী সমাধান, বিশেষ করে বোরো ধান, গম ও সবজি চাষের জমিতে। দেশের জলবায়ুর সঙ্গে মানানসই ডিজাইন করা উঁচু প্যানেলের নিচে বর্ষা মৌসুমে ধান এবং শুষ্ক মৌসুমে আলু বা সরিষা চাষ করে চলাফেরা করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার তীব্র সূর্যালোক ও দীর্ঘ কৃষি মৌসুমের সুবিধায় অ্যাগ্রিভোল্টাইক্স আয়প্রতি হেক্টর তিন থেকে চার গুণ বাড়াতে পারে।
তবে বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জও আছে — অল্প জমির মালিকদের সমবায় গঠন, প্যানেলের উচ্চ রক্ষণাবেক্ষণ খরচ এবং কৃষি উপকরণের বাধাহীন চলাচল নিশ্চিত করা। দেশে বেসরকারি উদ্যোক্তারা ইতিমধ্যে ভাসমান সোলার ও কৃষি-সৌর সহ-বসতির পাইলট প্রকল্প নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। যাঁরা নিজেদের জমিতে এই মডেল পরীক্ষা করতে চান, তাঁরা আমাদের যোগাযোগ পাতার মাধ্যমে প্রযুক্তিগত পরামর্শ নিতে পারেন। সঠিক নকশা, উপযুক্ত ফসল নির্বাচন এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষকরা একই জমি থেকে ফসল, খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ — তিনটি সুবিধাই একসঙ্গে নিশ্চিত করতে পারবেন।